উন্নয়নের স্বার্থে নৌকায় ভোট দিন

প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৮ ১৩:৫০:০৫ || আপডেট: ২০১৮-১০-২৮ ১৩:৫০:০৫

কর্ণফুলী ডেস্ক :

বরগুনার তালতলীতে বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদের স্থান বাংলাদেশে হবে না উন্নয়নের রোল মডেলের যে সম্মান পেয়েছি তা ধরে রাখতে হবে দক্ষিণাঞ্চলকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান গ্রেনেড ছুড়ে মারার চেষ্টা করেছিল এতিমদের টাকা চুরির দায়ে খালেদা জিয়ার জেল হয়েছে
শাহীন হাফিজ, বরগুনা ও পটুয়াখালী থেকে ফিরে
উন্নয়নের স্বার্থে নৌকায় ভোট দিন

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, উন্নয়নের স্বার্থে আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিন। যাকেই দলের প্রতীক দেওয়া হবে তাকেই বিজয়ী করে সেবা করার সুযোগ দিন। তিনি বলেন, উন্নয়নের রোল মডেলের যে সম্মান বাংলাদেশ পেয়েছে তা ধরে রাখতে হবে। গতকাল শনিবার বিকালে বরগুনার তালতলী উপজেলার বরবগি ইউনিয়ন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত জনতা শ্লোগান দিয়ে নৌকায় ভোট দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাবা-মা সব হারিয়ে, সেই শোক-ব্যাথা বুঁকে নিয়েও আমি কাজ করে যাচ্ছি। কাদের জন্য? বাংলার মানুষের জন্য। কারণ এই মানুষের জন্যই আমার বাবা জীবন দিয়ে গেছেন। আমার মা জীবন দিয়ে গেছেন। আমার ভাইয়েরা জীবন দিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি শুধু একটাই কারণ—বাংলাদেশকে যেন জাতির জনকের স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে পারি।

তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চল সবসময় অবহেলিত ছিলো। আমরা পায়রা বন্দর, স্কুল, কলেজ, কালভার্ট, সেতুসহ অনেক উন্নয়ন করেছি। ভবিষ্যতে আর কষ্ট করতে হবে না। পায়রায় বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে আরো বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। নদী পথ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌ-পথ সচলের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি করতে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল উত্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী একশ বছর পর যে বাংলাদেশ হবে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহন করে কাজ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে আমরা যে সম্মান পেয়েছিলাম, পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যা করে সে সম্মান হারিয়ে গিয়েছিল। আজকে আবার দেশের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সেই সম্মান ফিরে পেয়েছি। সেই সম্মান ধরে রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদের স্থান বাংলাদেশে হবে না। আমাদের লক্ষ্য একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না ও চিকিত্সা বঞ্চিত হবে না। সে লক্ষ্যে আমরা নানান পদক্ষেপ গ্রহন করেছি ও জেলা-উপজেলায় শিক্ষক, চিকিত্সক ও নার্স নিয়োগ করেছি।

৩০ মিনিটের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে তখনই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ কিছু না কিছু পায়। কলাপাড়ায় ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছে তার সুবিধাও আপনারাই ভোগ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক এলাকায় ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে মানুষ ২০০ ধরনের সেবা পাচ্ছে। এ ব্যবস্থা আরো উন্নত করার জন্য আমরা মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উক্ষেপন করেছি। গ্রামের মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে শহরের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ১৫ আগস্টের ভয়াল স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার জীবনের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। এদেশের মানুষ ভালো থাকবে এটাই আমার লক্ষ্য। ২১ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান আমাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থেকে দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে জঙ্গিবাদের উত্থান করেছিলো। তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাই মানি লন্ডারিংসহ নানান অপকর্মে জড়িত রয়েছে। তিনি বলেন, এতিমদের টাকা চুরির দায়ে খালেদা জিয়ার জেল হয়েছে। এতিমদের টাকা আসে এতিমদের জন্য, এতিমদের সম্পদ মেরে খেলে শাস্তি পেতে হয়। তিনি বলেন, তার (খালেদা জিয়ার) ছেলে তারেক রহমান দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।

তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজবি-উল কবির জমাদ্দারের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, শওকত হাচানুর রহমান এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহে আলম, বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, বরগুনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বেতাগী পৌরসভার মেয়র এবিএম গোলাম কবির। সভা সঞ্চালনা করেন বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গির কবির ও সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরওয়ার টুকু।

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, তালতলীতে জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পায়নের কার্যক্রম চলছে। রাস্তাঘাট উন্নয়ন, পর্যটন বিকাশসহ এ অঞ্চলকে শিল্পাঞ্চলে পরিণত করা হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পায়রা বন্দর হবে দক্ষিণাঞ্চলের শ্রেষ্ট সম্পদ। তিনিও নৌকায় ভোট দিয়ে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার আহবান জানান। তিনি বলেন, বিএনপি কখনোই আন্দোলন করতে পারে না। ১০ বছরে ২০টি ঈদ গেছে, আন্দোলন হয় নাই। বিএনপি এখন ভুয়া পার্টিতে পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টার যোগে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় পটুয়াখালীর পায়রা তাপ বিদ্যুত্ প্রকল্প এলাকায় যান। সেখানে বিদ্যুত্ কেন্দ্র প্রকল্প ও বয়লার টাওয়ার পরিদর্শন; পুনর্বাসন কেন্দ্রে গমণ ও মত্স্য পোনা অবমুক্তকরণ, বৃক্ষরোপণ, নবনির্মিত পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাড়ি পরিদর্শন এবং পুনর্বাসিত পরিবারের সদস্যদের মাঝে বাড়ির চাবি ও দলিল হস্তান্তর; চেয়ারম্যান, সিএমসি কর্তৃক প্রদত্ত স্কাউটস-এর চেক গ্রহণ শেষে পটুয়াখালী জেলার ১৬ প্রকল্পের উদ্বোধন ও ৬ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে সুধী সমাবেশে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বরগুনা জেলায় যে ২১ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তার মধ্যে রয়েছে

বরগুনা সদর হাসপাতালকে ৫০ শয্যা হতে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরন, বামনা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, বেতাগী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, বরগুনা জেলা গণগ্রন্থাগার, জেলা পুলিশ লাইনে মহিলা ব্যারাক নির্মাণ, ঘুর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, তালতলী উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন; বামনা উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন সম্প্রসারণ ইত্যাদি।

দক্ষিণাঞ্চলে একটি মাস্টার প্ল্যানের অধীনে উন্নয়ন হচ্ছে:পায়রায় প্রধানমন্ত্রী

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রায় ১,৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের কারণে ভূমি হারানো লোকদের পুনর্বাসনের জন্য গৃহীত হাউজিং প্রকল্প ‘স্বপ্নের ঠিকানা’সহ ২১ টি প্রকল্পের উদ্বোধনের আগে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে বলেন, ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রণীত মাস্টার প্লানের অধীনে তার সরকার সকল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একই কোম্পানি নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি আরো ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন প্লান্ট নির্মাণ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার দক্ষিণাঞ্চলে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার দক্ষিণাঞ্চলে একটি নৌবাহিনী ঘাঁটি এবং একটি বিমান বাহিনী ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য একটি সেনানিবাস নির্মাণ করছে। ইতিমিধ্যেই পটুয়াখালীর তালতলি এলাকায় একটি শিপবিল্ডিং এবং একটি শিপ রিসাইকেলিং শিল্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বপ্নের ঠিকানা প্রকল্পে ১৩০টি পরিবার তাদের ঘর পেয়েছে। তারা একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছে। তিনি বলেন, ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ প্রকল্পটি দেশের মধ্যে সর্ববৃহত্ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র। এটি বাস্তবায়িত হলে বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানও হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে স্থানীয় জনগণের আশ্রয়ের জন্য বিদ্যুত্ প্রকল্পে একটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। শেখ হাসিনা বলেন, বিগত দশ বছরে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তাঁর সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অর্জিত ব্যাপক সমুদ্র এলাকায় ব্লু ইকোনমি অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করেছে। তিনি বলেন, নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে পর্যায়ক্রমে সকল নদী ড্রেজিং করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী এই সমাবেশেও চলমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে নৌকায় ভোট দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী পরে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর মধ্যে বাড়ির চাবি হস্তান্তর এবং হাউজিং এলাকায় পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত ও একটি নারিকেলের চাড়া রোপন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী পালন এবং ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করা হবে। ২০২০-২০২১ সালকে আমরা মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি।’

সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন পটুয়াখালী-৪ আসনের (কলাপাড়া) এমপি এবং সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহাবুবুর রহমান তালুকদার। এই সমাবেশেও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রমুখ।

ট্যাগ :