চট্টগ্রাম কারাগার যেন বন্দি বাণিজ্যকেন্দ্র

প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৮ ০৬:৩৫:৩৭ || আপডেট: ২০১৮-১০-২৮ ০৬:৩৬:৫৯

কর্ণফুলী ডেস্ক:

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা এক হাজার ৭১৩ জন। কিন্তু গতকাল শনিবার এই কারাগারে বন্দি ছিল ৯ হাজার ৫২৫ জন। ধারণক্ষমতার চেয়ে সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি বন্দির এই কারাগারকে রীতিমতো ‘বন্দি বাণিজ্যকেন্দ্র’ বানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। বন্দিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে টাকা গুনতে হয় আসামিদের। কয়েকজন হাজতির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই বাণিজ্যের পরিমাণ মাসে প্রায় দেড় কোটি টাকা। কারারক্ষী থেকে শুরু করে জেলারসহ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন। খবর কালের কণ্ঠ

কোটি টাকার এই বাণিজ্য নিয়ে তিন কর্মকর্তার বিরোধ চলছিল প্রায় তিন মাস ধরে। শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস মাদক ও ৫৪ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গ্রেপ্তারের পর সোহেল রানা সাংবাদিকদের

কাছে দাবি করেছেন, এসব টাকা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের কারা উপমহাপরিদর্শক পার্থ গোপাল বণিকের। তাঁদের কাছে টাকাগুলো ঢাকায় নিয়ে হস্তান্তরের কথা ছিল বলে দাবি জেলার সোহেল রানার। তবে রানার নামেও প্রায় তিন কোটি টাকা ডিপোজিটের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

সোহেল রানার দেওয়া তথ্য অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পার্থ গোপাল বণিক ও সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক। তাঁদের ভাষ্য মতে, কারাগারের কিছু বন্দির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর দুই দফায় সাতজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। এ কারণে জেলার সোহেল রানা সংক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদের নাম বলতে পারেন। তাঁরা তো চট্টগ্রামের। ঢাকায় কেন তাঁদের টাকা দিতে বলবেন?

জেলার সোহেল রানা ২০০২ সালের পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার পদে কর্মরত ছিলেন। তখন থেকেই অবৈধভাবে টাকা আদায় করতেন বলে জানিয়েছেন ওই সময়ে একটি মামলার হাজতি বন্দি শামসুল হক জাবেদ। তিনি বলেন, ‘আমি একটি রাজনৈতিক মামলায় ২০০২ সালে কারাগারে গিয়েছিলাম। আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জেল থেকে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে সোহেল রানা আমার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। না হলে অন্য মামলায় আমাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।’

ডেপুটি জেলার হিসেবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বেশ কয়েক বছর চাকরির পর সোহেল রানা অন্যত্র বদলি হন। পরে জেলার পদে পদোন্নতি পেলে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যোগদান করেন। চট্টগ্রামে এসেই পুরনো পথে হাঁটেন সোহেল। তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের জামিন হওয়ার পর মুক্তির আগে পুলিশকে খবর দেবেন এবং পুলিশ পুনরায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে এমন ভয় দেখিয়ে শত শত হাজতি বন্দির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ আছে।

কারাগারের কয়েকজন ডেপুটি জেলার ও কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া সোহেল রানা নিজেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দিতেন। কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের বিষয় উল্লেখ করতেন। এ কারণে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ অমান্য করতেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেন। এ ছাড়া সোহেল রানার মাদক সেবনের বিষয়টি ছিল প্রকাশ্যে। কারাগারে জেলারের কক্ষে বসে আলাপের সময়ও তাঁকে অপ্রকৃতিস্থ দেখা যেত।

তিন দফা কারাগারে থাকা বিভুতি রঞ্জন নামের একজন হাজতি বন্দি শনিবার আলাপকালে বলেন, ‘আমি খুব কাছ থেকেই কারাগারে চাঁদাবাজির দৃশ্য দেখেছি। সেখানে বন্দিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলে। ওয়ার্ডে নেওয়ার পর হাজতি বন্দিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়। হাজতিরা পরিবারের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে দিতে বাধ্য হয়। না হলে সকাল-সন্ধ্যা তিন দফা পিটুনি দেওয়া হয় হাজতিদের। প্রতিজন হাজতির কাছ থেকে দুই হাজার থেকে ৮-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এরপর ক্যান্টিনে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য। সেখানে একটি ফার্মের মুরগি বিক্রি হয় ৬০০ টাকা। রান্না বাবদ দিতে হয় আরো ২০০ টাকা। হাসপাতালে সিট নিতে গেলে দিতে হয় পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।

প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বন্দির এই কারাগারে দৈনিক অন্তত পাঁচ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয় বলে দাবি করেন এই সদ্য মুক্তি পাওয়া হাজতি বন্দি। তিন দফা কারাভোগের পর তিনি হিসাব কষেই আরো বললেন, ‘আমার হিসাবে দৈনিক গড়ে পাঁচ লাখ টাকা।’ হিসাবের নানা খাত উল্লেখ করে বললেন, ‘আমদানি ওয়ার্ড, সাধারণ ওয়ার্ড, হাসপাতাল, ক্যান্টিন, রান্নাঘর, দেখা-সাক্ষাৎ এবং মাদক ও রাজনৈতিক মামলায় জামিনের পর পুনরায় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নাম করে আদায় করা মোটা অঙ্কের টাকাসহ দৈনিক পাঁচ লাখের বেশি হবে।’

তিনি জানান, আদায় করা সব টাকা যায় জেলারের কাছে। পরে টাকাগুলো ভাগ-বাটোয়ারা হয়। কারারক্ষী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সবাই এসব টাকার ভাগ পায়।

হাজতি বন্দির এসব কথার সত্যতা পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের পর সোহেল রানার বক্তব্যেও। তিনিও দাবি করেছেন, উদ্ধার করা টাকাগুলো সিনিয়র জেল সুপার ও ডিআইজিকে দেওয়ার জন্য বহন করছিলেন।

জেলার সোহেল রানা কারাগারে খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। এ কারণে সামিয়া এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজ না পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগও দিয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে সোহেল রানা বিশ্বাস রয়েছেন বলে কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের নানা অনিয়ম বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার পাল বলেন, ‘কিছু অনিয়ম দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর দুই দফায় সাতজনকে বদলি করা হয়। এর পর থেকেই জেলার সোহেল রানা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এ কারণে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ সোহেল রানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল। এর আগেই মাদক ও টাকাসহ ধরা পড়লেন তিনি।’

একই বিষয়ে কারা উপমহাপরিদর্শক পার্থ গোপাল বণিক বলেন, ‘সোহেল রানার অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। সেই ক্ষোভ থেকে তিনি এসব কথা বলতে পারেন।’

আগেও সাসপেন্ড হয়েছিলেন জেলার সোহেল রানা

মাদক ও বিপুল অঙ্কের টাকা, চেকসহ গ্রেপ্তার জেলার সোহেল রানা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আগেও অপরাধ করার রেকর্ড রয়েছে। তিনি শুধু উেকাচ গ্রহণই নয়, মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণও করতেন। তিনি ২০১২ সালের দিকে ঊর্ধ্বতন এক কারা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করেন। ওই সময় কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরে তিনি আবার চাকরি ফিরে পান। তাঁকে খাগড়াছড়িতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই সোহেল রানা কিছুদিন ভালো কাজ দেখিয়ে নরসিংদী, চট্টগ্রামের মতো কারাগারে জেলার হিসেবে দায়িত্ব পেতে সক্ষম হন।

কারা সূত্র জানায়, বছরখানেক আগে থেকে চট্টগ্রামের জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সোহেল রানা। এর আগে তিনি নরসিংদী কারাগারের জেলার ছিলেন। চট্টগ্রাম কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সেবনসহ নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল বলে এক কারা কর্মকর্তা জানান। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাঁকে ধরা যাচ্ছিল না। অবশেষে গত শুক্রবার ধরা পড়লেন রেলওয়ে পুলিশের হাতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (চট্টগ্রাম বিভাগ) পার্থ গোপাল বণিক বলেন, ‘সোহেল রানা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হবে।’

অন্যদিকে কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন একটি সেমিনারে যোগ দিতে কানাডায় রয়েছেন। গত ২০ অক্টোবর তিনি সেখানে যান। শুক্রবার সোহেল রানা ধরা পড়ার পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা টেলিফোনে বিষয়টি আইজি প্রিজনসকে অবহিত করেন। তিনি মৌখিকভাবে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন। আজ রবিবার তাঁর কানাডা থেকে দেশে ফেরার কথা। তিনি ফিরলেই লিখিতভাবে তাঁকে বরখাস্ত করা হবে।

নিজ এলাকা ও দপ্তরে বদরাগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন সোহেল রানা

টাকা, চেক, ফেনসিডিলসহ আটক হওয়া চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সোহেল রানা গ্রামের বাড়ি ও নিজ এলাকা ধোবাউড়ায় বদরাগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিজ কর্মক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বেপরোয়া। সোহেল রানার নিজ গ্রাম ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার পোড়াকান্দুলিয়া গ্রামে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ধোবাউড়া উপজেলার পোড়াকান্দুলিয়া মুক্তিযোদ্ধা জিন্নত আলীর ছেলে সোহেল রানা চাকরি করার পর নিজ গ্রামে বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ শহরেও গোপনে একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে জানা গেছে।

সোহেল রানার গ্রামের বাড়ির একাধিক ব্যক্তি বলেন, সোহেল রানা একেবারেই একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান। তবে চাকরি হওয়ার পর নিজ গ্রামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলেন। আরেকটি সূত্র জানায়, নিজের বাবার বাড়িতে যতটুকু সম্পদ সোহেল রানা করেছেন, এর চেয়ে বহুগুণ সম্পদ করেছেন স্ত্রীর নামে এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সহায়তায়।

সোহেল রানার পরিবার ময়মনসিংহ শহরের পণ্ডিতপাড়া এলাকায় মোমেনশাহী টাওয়ারে বসবাস করে। এটি তাদের ক্রয় করা বলে জানা গেছে। তবে গতকাল শনিবার ওই বাসায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। সোহেল রানার স্ত্রী ও অন্যরা তাঁর আটক হওয়ার খবর পেয়ে ঢাকায় গেছে বলে জানা গেল।

ওই ফ্ল্যাটের একজন বাসিন্দা জানান, তাঁরা শুনেছেন পাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে সোহেল রানা ময়মনসিংহে আসছিলেন। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারাগারে কর্মরত একজন কর্মকর্তা জানান, সোহেল রানা এর আগেও নিজ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছিলেন। তাঁর বদ মেজাজের খবর ওপেন সিক্রেট।

জেলহাজতে সোহেল রানা

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ১২ বোতল ফেনসিডিল, নগদ ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তার চট্টগ্রাম জেলা কারা পরিদর্শক সোহেল রানা বিশ্বাসকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পর দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে তাঁকে কিশোরগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায় ভৈরব রেলওয়ে থানা পুলিশ। আদালতের বিচারক আবদুন নূর আগামী সোমবার রিমান্ডের শুনানি ধার্য করে সোহেল রানা বিশ্বাসকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।